বাংলাখবর
কোরআন নয়, বাংলা বই: অস্ট্রেলিয়ার এক মসজিদে লুকিয়ে থাকা বিস্ময়কর ইতিহাস
অনলাইন ডেস্ক : অস্ট্রেলিয়ার প্রত্যন্ত মরু শহর ব্রোকেন হিল। উনিশ শতকের শেষ ভাগে নির্মিত একটি ছোট টিনের মসজিদ বহু বছর ধরে নীরবে সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এক বিস্মৃত ইতিহাসের। সেই মসজিদের একটি আলমারিতে বহু দশক ধরে সংরক্ষিত ছিল একটি মোটা, ধুলিধূসর বই। স্থানীয় মানুষ, এমনকি ইতিহাসবিদদের অনেকেই বিশ্বাস করতেন, সেটি একটি কোরআন শরীফ।
কিন্তু একদিন জানা গেল, বইটি কোরআন নয়।
এটি বাংলা ভাষায় রচিত একটি সুফি কাব্যগ্রন্থ, নাম কাসাসুল আম্বিয়া। আর এই আবিষ্কার শুধু একটি বইয়ের পরিচয়ই বদলে দেয়নি; নতুন করে উন্মোচন করেছে অস্ট্রেলিয়ায় দক্ষিণ এশীয় মুসলমানদের উপস্থিতি, তাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং ভারত মহাসাগর পেরিয়ে গড়ে ওঠা এক বিস্ময়কর ইতিহাস।
এই আবিষ্কারের নেপথ্যে ছিলেন বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া ইতিহাসবিদ ড. সামিয়া খাতুন।
শৈশবে পরিবারের সঙ্গে ঢাকা থেকে অস্ট্রেলিয়ায় চলে যান তিনি। বহু বছর পরে দক্ষিণ এশীয় অভিবাসীদের ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে একটি অস্ট্রেলীয় ইতিহাসগ্রন্থে "ব্রোকেন হিল মসজিদের" সেই “কোরআন”-এর উল্লেখ তাঁর চোখে পড়ে। কৌতূহল থেকে তিনি সিদ্ধান্ত নেন, বইটি নিজে গিয়ে দেখবেন।
২০০৯ সালে তিনি যখন মসজিদে পৌঁছান এবং বইটি প্রথম খুলে দেখেন, তখনই বুঝতে পারেন, এটি আরবি নয়, বাংলা ভাষায় লেখা। তবে বাংলা হলেও ভাষাটি ছিল এতটাই প্রাচীন ও জটিল যে প্রথম দর্শনেই পড়া সম্ভব হয়নি।
সেই মুহূর্তে তিনি প্রথম ফোন করেছিলেন তাঁর মাকে।
মায়ের কাছে কয়েকটি লাইন পড়ে শোনাতেই মা বলেছিলেন, “এভাবে পড়তে হয় না। এটি গেয়ে পড়তে হয়।”
সেই একটি বাক্য যেন বইটির প্রকৃত পরিচয় খুলে দেয়।
ড. সামিয়া উপলব্ধি করেন, এটি সাধারণ পাঠ্য নয়। এটি এমন এক সাহিত্য, যা সুর করে, বিশেষ ভঙ্গিতে, শিক্ষিত শ্রোতাদের সামনে পরিবেশন করার জন্য রচিত।
কিন্তু বইটি পড়া সহজ ছিল না।

ধ্রুপদী বাংলা, ফারসি ও আরবি শব্দে সমৃদ্ধ এই গ্রন্থের ভাষা বুঝতে তাঁর প্রায় সাত বছর সময় লেগেছিল। ধীরে ধীরে তিনি আবিষ্কার করেন, এটি কাসাসুল আম্বিয়া বা নবীদের কাহিনি নিয়ে রচিত একটি সুবৃহৎ বাংলা সুফি সাহিত্যসংকলন। এর প্রথম খণ্ড উনিশ শতকের মাঝামাঝি প্রকাশিত হয়েছিল এবং পরে একাধিক খণ্ড প্রকাশিত হয়।
এরপর শুরু হয় আরও বড় অনুসন্ধান।
বাংলার একটি বই কীভাবে অস্ট্রেলিয়ার মরুভূমির কিনারায় অবস্থিত একটি ছোট্ট মসজিদে পৌঁছাল?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে ড. সামিয়া খাতুন প্রবেশ করেন অস্ট্রেলিয়ার বিস্মৃত ইতিহাসে।
উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে অস্ট্রেলিয়ার মরু ও দুর্গম অঞ্চলে উটের কাফেলা ছিল পরিবহনের প্রধান ভরসা। এই উটচালকদের সবাইকে তখন সাধারণভাবে “আফগান” বলা হলেও বাস্তবে তাঁদের অনেকেই এসেছিলেন বর্তমান বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান এবং দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য অঞ্চল থেকে। তাঁরা শুধু শ্রমিক ছিলেন না; সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন নিজেদের ভাষা, ধর্ম, সাহিত্য এবং সংস্কৃতি।
ব্রোকেন হিলের মসজিদটি ১৮৮৭ সালে নির্মিত হয়। এটি আজও অস্ট্রেলিয়ায় উটচালকদের নির্মিত টিকে থাকা অল্প কয়েকটি ঐতিহাসিক মসজিদের একটি। সেই মসজিদের ছোট্ট আলমারিতে বহু বছর ধরে সংরক্ষিত ছিল বাংলার এই মূল্যবান গ্রন্থ।
মসজিদের দীর্ঘদিনের তত্ত্বাবধায়ক বব শ্যামরোজ স্মরণ করেন, বইটি যখন উদ্ধার করা হয়, তখন সেটি ছিল অত্যন্ত জীর্ণ। প্রচ্ছদ প্রায় ছিল না, অনেক পৃষ্ঠা ছিঁড়ে গিয়েছিল। কেউ বইটির ভাষা বুঝতে পারেননি। তাই সেটির গায়ে ইংরেজিতে লিখে দেওয়া হয়েছিল, “The Holy Koran”।
দশকের পর দশক সেই ভুল পরিচয়ই প্রচলিত ছিল। ড. সামিয়ার গবেষণা সেই ভুল সংশোধন করে।
কিন্তু তাঁর কাছে এই গবেষণা শুধু একটি বই শনাক্ত করার কাজ ছিল না।
তিনি পরে বলেন, “আমি বইটিকে খুঁজে পাইনি; বইটিই যেন আমাকে খুঁজে পেয়েছিল।”
এই অনুভূতির পেছনে ছিল আরও একটি ব্যক্তিগত আবিষ্কার।
বহু বছর পরে তিনি সিডনিতে তাঁর পরিবারের কাছে সংরক্ষিত প্রপিতামহ কাজী মোতাহার হোসেনের স্মৃতিকথা পড়ার সুযোগ পান। কাসাসুল আম্বিয়ার ভাষা শেখার কারণেই তিনি সেই স্মৃতিকথা পড়তে সক্ষম হন। সেখানে তিনি জানতে পারেন, তাঁর প্রপিতামহ জীবনে প্রথম যে বাংলা বইটি পড়েছিলেন, সেটিও ছিল কাসাসুল আম্বিয়া। আরও জানা যায়, তাঁর প্রপিতামহের পিতা ছিলেন সেইসব পণ্ডিতদের একজন, যারা নিয়মিত এই কাব্য গেয়ে পরিবেশন করতেন।
একটি বই যেন এক শতাব্দীরও বেশি সময় অতিক্রম করে একই পরিবারের দুই প্রজন্মকে আবার যুক্ত করে দিল।

এই ঘটনাই ড. সামিয়া খাতুনকে নতুনভাবে ভাবতে শেখায় ইতিহাসকে।
ইতিহাস কেবল সরকারি নথি, প্রশাসনিক দলিল কিংবা ইংরেজি ভাষার বিবরণে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের সঙ্গে ভ্রমণ করা বই, গান, ভাষা এবং স্মৃতিও ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ দলিল হতে পারে।
আজও নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি, কে এই বাংলা বইটি ব্রোকেন হিলে নিয়ে এসেছিলেন। হয়তো কোনো উটচালক, হয়তো কোনো ধর্মীয় পণ্ডিত, অথবা ভারত মহাসাগর পেরিয়ে আসা কোনো অজানা ভ্রমণকারী। কিন্তু বইটির উপস্থিতি প্রমাণ করে, অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাস কেবল ইউরোপীয় বসতিস্থাপনকারীদের ইতিহাস নয়; এর ভেতরে দক্ষিণ এশীয় মুসলমানদেরও এক গভীর ও সমৃদ্ধ অধ্যায় লুকিয়ে আছে।
ব্রোকেন হিলের সেই পুরোনো মসজিদে সংরক্ষিত কাসাসুল আম্বিয়া আজ শুধু একটি বাংলা বই নয়। এটি দুই মহাদেশ, দুই শতাব্দী এবং অসংখ্য মানুষের জীবনকে যুক্ত করে রাখা এক ঐতিহাসিক সেতুবন্ধনের প্রতীক।
এক সময় যাকে সবাই কোরআন ভেবেছিল, সেই বই-ই আজ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কখনও কখনও একটি ভুলে যাওয়া বই ইতিহাসের নতুন দরজা খুলে দিতে পারে। সূত্র : এবিসি নিউজ অবলম্বনে এম তৌফিকুর রহমান
এই বিভাগের আরও খবর
ওমরাহ ভিসা থাকলেও যাওয়া যাবে না সৌদি, মানতে হবে শর্ত
ওমরাহ ভিসা থাকলেও যাওয়া যাবে না সৌদি, মানতে হবে শর্ত
কোরআন নয়, বাংলা বই: অস্ট্রেলিয়ার এক মসজিদে লুকিয়ে থাকা বিস্ময়কর ইতিহাস
কোরআন নয়, বাংলা বই: অস্ট্রেলিয়ার এক মসজিদে লুকিয়ে থাকা বিস্ময়কর ইতিহাস
তিন মাসে ওমরাহ করেছেন রেকর্ড ১ কোটি ১৩ লাখ মানুষ
তিন মাসে ওমরাহ করেছেন রেকর্ড ১ কোটি ১৩ লাখ মানুষ
১০৪ বছর বয়সে হজ পালন করে নজির গড়লেন বৃদ্ধা
১০৪ বছর বয়সে হজ পালন করে নজির গড়লেন বৃদ্ধা
হজের খুতবায় ঐক্য, তাকওয়া ও শৃঙ্খলার আহ্বান জানালেন শায়খ আল-হুযাইফি
হজের খুতবায় ঐক্য, তাকওয়া ও শৃঙ্খলার আহ্বান জানালেন শায়খ আল-হুযাইফি
পবিত্র হজ আজ, লাব্বাইক ধ্বনিতে মুখর হওয়ার অপেক্ষায় আরাফাতের ময়দান
পবিত্র হজ আজ, লাব্বাইক ধ্বনিতে মুখর হওয়ার অপেক্ষায় আরাফাতের ময়দান
হজে ইন্দোনেশীয়দের কোরবানির পশুর মাংস যাবে ফিলিস্তিনিদের কাছে
হজে ইন্দোনেশীয়দের কোরবানির পশুর মাংস যাবে ফিলিস্তিনিদের কাছে
হজ চলাকালে ইরানে হামলা না করতে ট্রাম্পকে অনুরোধ সৌদির
হজ চলাকালে ইরানে হামলা না করতে ট্রাম্পকে অনুরোধ সৌদির
বাংলাদেশে ঈদুল আজহা ২৮ মে
বাংলাদেশে ঈদুল আজহা ২৮ মে
ঈদুল আজহার তারিখ ঘোষণা করল কাতার
ঈদুল আজহার তারিখ ঘোষণা করল কাতার
হজে গিয়ে ১০ বাংলাদেশির মৃত্যু
হজে গিয়ে ১০ বাংলাদেশির মৃত্যু
অবৈধ হজযাত্রীকে আশ্রয় দিলেই ১ লাখ রিয়াল জরিমানা
অবৈধ হজযাত্রীকে আশ্রয় দিলেই ১ লাখ রিয়াল জরিমানা
